শিমুল অধিকারী সুমন, চাঁদপুর
‘ইলিশের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত চাঁদপুর। পদ্মা-মেঘনার মিলনস্থলের এই জনপদে একসময় নদীতে জাল ফেললেই ধরা পড়ত ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ। জেলেদের নৌকা ফিরত মাছভর্তি হয়ে। ইলিশকে ঘিরে জমজমাট থাকত নদী ও মাছের বাজার।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। পদ্মা-মেঘনায় কমেছে ইলিশের বিচরণ। অনেক জেলের জাল উঠছে আগের তুলনায় অনেকটাই ফাঁকা। দিনভর নদীতে জাল ফেলেও মিলছে মাত্র কয়েক কেজি মাছ। এর মধ্যে বড় আকারের ইলিশের দেখা মিলছে আরও কম।
নদীতে ইলিশের সংকটে একদিকে বিপাকে পড়েছেন জেলেরা, অন্যদিকে কমেছে বাজারে সরবরাহ। চাহিদা থাকলেও মাছের পরিমাণ কম থাকায় বাড়ছে দাম। ফলে জাতীয় মাছ ইলিশ এখন অনেক সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জেলেরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও নদীতে যে পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যেত, বর্তমানে তার তুলনায় অনেক কম মাছ ধরা পড়ছে। মাছ কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও কমেছে। অথচ নদীতে মাছ ধরার জন্য নৌকা, জাল, জ্বালানি ও শ্রমিকের পেছনে খরচ কমেনি।
জেলেদের কেউ কেউ বলছেন, ইলিশের বিচরণ ও সুরক্ষায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হলেও সব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে নদী ও সাগর মোহনায় ইলিশের বিচরণক্ষেত্র সুরক্ষায় আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণের কথা বলছেন জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তাদের অন্যতম অভিযোগ, পদ্মা-মেঘনার বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে ডুবোচর। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলেদের ধারণা, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় সাগর থেকে উজানে ইলিশের চলাচলের পথেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। ফলে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় আগের মতো ইলিশের বিচরণ দেখা যাচ্ছে না।
তবে ইলিশের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে শুধু ডুবোচর বা নাব্যতা সংকটই দায়ী কি না, তা নিয়ে আরও গবেষণা ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ইলিশ রক্ষায় নদীতে তৎপর রয়েছে নৌ পুলিশ। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার করে ইলিশ ধরার অভিযোগে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মামলা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নীলকমল নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. আসাদুজ্জামান হাওলাদার বলেন, ইলিশসহ মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় নদীতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহারসহ আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, আগের তুলনায় ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। তবে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে ইলিশের বিচরণ ও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
চাঁদপুরের সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চাঁদপুরের অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ইলিশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ইলিশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলে, আড়তদার, মাছ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নদীপাড়ের অসংখ্য মানুষের জীবিকা। তাই নদীতে ইলিশ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু বাজারদরেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে পুরো মৎস্য অর্থনীতিতে।
এখন প্রশ্ন—পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের এই সংকট কি সাময়িক, নাকি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চাঁদপুরের নদী ও ইলিশের পুরোনো সম্পর্ক?
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, অবৈধ জাল বন্ধ, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সুরক্ষা এবং কার্যকর অভিযান নিশ্চিত করা গেলে আবারও পদ্মা-মেঘনায় ফিরতে পারে রুপালি ইলিশ—এমন প্রত্যাশা নদীপাড়ের মানুষের।
তবে তা না হলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে শুধু জেলেদের জীবিকা নয়, চাঁদপুরের বহুল পরিচিত ‘ইলিশের বাড়ি’ পরিচয়ও।

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬
শিমুল অধিকারী সুমন, চাঁদপুর
‘ইলিশের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত চাঁদপুর। পদ্মা-মেঘনার মিলনস্থলের এই জনপদে একসময় নদীতে জাল ফেললেই ধরা পড়ত ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ। জেলেদের নৌকা ফিরত মাছভর্তি হয়ে। ইলিশকে ঘিরে জমজমাট থাকত নদী ও মাছের বাজার।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। পদ্মা-মেঘনায় কমেছে ইলিশের বিচরণ। অনেক জেলের জাল উঠছে আগের তুলনায় অনেকটাই ফাঁকা। দিনভর নদীতে জাল ফেলেও মিলছে মাত্র কয়েক কেজি মাছ। এর মধ্যে বড় আকারের ইলিশের দেখা মিলছে আরও কম।
নদীতে ইলিশের সংকটে একদিকে বিপাকে পড়েছেন জেলেরা, অন্যদিকে কমেছে বাজারে সরবরাহ। চাহিদা থাকলেও মাছের পরিমাণ কম থাকায় বাড়ছে দাম। ফলে জাতীয় মাছ ইলিশ এখন অনেক সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জেলেরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও নদীতে যে পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যেত, বর্তমানে তার তুলনায় অনেক কম মাছ ধরা পড়ছে। মাছ কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও কমেছে। অথচ নদীতে মাছ ধরার জন্য নৌকা, জাল, জ্বালানি ও শ্রমিকের পেছনে খরচ কমেনি।
জেলেদের কেউ কেউ বলছেন, ইলিশের বিচরণ ও সুরক্ষায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হলেও সব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে নদী ও সাগর মোহনায় ইলিশের বিচরণক্ষেত্র সুরক্ষায় আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণের কথা বলছেন জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তাদের অন্যতম অভিযোগ, পদ্মা-মেঘনার বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে ডুবোচর। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলেদের ধারণা, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় সাগর থেকে উজানে ইলিশের চলাচলের পথেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। ফলে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় আগের মতো ইলিশের বিচরণ দেখা যাচ্ছে না।
তবে ইলিশের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে শুধু ডুবোচর বা নাব্যতা সংকটই দায়ী কি না, তা নিয়ে আরও গবেষণা ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ইলিশ রক্ষায় নদীতে তৎপর রয়েছে নৌ পুলিশ। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার করে ইলিশ ধরার অভিযোগে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মামলা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নীলকমল নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. আসাদুজ্জামান হাওলাদার বলেন, ইলিশসহ মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় নদীতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহারসহ আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, আগের তুলনায় ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। তবে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে ইলিশের বিচরণ ও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
চাঁদপুরের সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চাঁদপুরের অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ইলিশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ইলিশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলে, আড়তদার, মাছ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নদীপাড়ের অসংখ্য মানুষের জীবিকা। তাই নদীতে ইলিশ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু বাজারদরেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে পুরো মৎস্য অর্থনীতিতে।
এখন প্রশ্ন—পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের এই সংকট কি সাময়িক, নাকি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চাঁদপুরের নদী ও ইলিশের পুরোনো সম্পর্ক?
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, অবৈধ জাল বন্ধ, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সুরক্ষা এবং কার্যকর অভিযান নিশ্চিত করা গেলে আবারও পদ্মা-মেঘনায় ফিরতে পারে রুপালি ইলিশ—এমন প্রত্যাশা নদীপাড়ের মানুষের।
তবে তা না হলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে শুধু জেলেদের জীবিকা নয়, চাঁদপুরের বহুল পরিচিত ‘ইলিশের বাড়ি’ পরিচয়ও।

আপনার মতামত লিখুন