মোঃ ওয়াশিম, চট্টগ্রাম
তিন মেয়েকে নিয়ে মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠাঁই নেই বিধবা সারাবান তাহুরার। সন্তানের হার্নিয়া অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন রাজীব দাশ। বাবা-মাকে হারানো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মিজান মিয়ার উচ্চশিক্ষাও অর্থাভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কেউ আবার প্যারালাইসিস, হৃদ্রোগ কিংবা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারছেন না।
জীবনের এমন নানা সংকট নিয়ে বুধবার (১২ আগস্ট) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে হাজির হন তাঁরা। সঙ্গে ছিল নিজেদের অসহায়ত্ব ও প্রয়োজনের কথা জানিয়ে লেখা আবেদনপত্র।
তবে আবেদন গ্রহণ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। একে একে প্রত্যেকের কথা শোনেন তিনি। জানতে চান তাঁদের পরিবার, আয়-রোজগার, চিকিৎসা, পড়াশোনা ও বসবাসের বর্তমান পরিস্থিতি। প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কয়েকজনকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করেন তিনি।
গণশুনানিতে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছেন বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের সারাবান তাহুরা। প্রায় দুই বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন মেয়েকে নিয়ে তাঁর জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর তিন মেয়ের বয়স ১০, ৮ ও ৪ বছর। স্বামী পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন। সেখানে নিরাপত্তাহীনতার মুখে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় তিন মেয়েকে নিয়ে দেশে ফেরেন সারাবান।
দেশে ফেরার পর স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের সহযোগিতায় প্রায় এক বছর আশ্রয়ে ছিলেন তিনি। পরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পূর্ব চাম্বল আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে সাময়িকভাবে থাকার সুযোগ পান। কিন্তু ঘরটি অন্য একজনের নামে বরাদ্দ থাকায় সেটিও ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে তাঁকে।
নিজের কোনো জমি বা বসতভিটা নেই সারাবানের। সেলাইয়ের কাজ করে তিন মেয়ের ভরণপোষণ চালান তিনি। সন্তানদের নিয়ে আবারও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় বাহারছড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে সরকারি খাস জমিতে একটি ঘর নির্মাণ কিংবা পুনর্বাসনের আবেদন নিয়ে জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হন তিনি।
সন্তানের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চেয়ে গণশুনানিতে আসেন চন্দনাইশের রাজীব দাশ। তাঁর শিশুসন্তান জন্মগত হার্নিয়ায় আক্রান্ত। অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। অর্থের অভাবে সন্তানের চিকিৎসা যেন বন্ধ না হয়, সে জন্য জেলা প্রশাসকের সহযোগিতা চান তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মিজান মিয়ার সংকট আবার ভিন্ন। তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বাবা-মা দুজনই মারা গেছেন। তাঁর পড়াশোনার ব্যয় বহনের মতো পরিবারে আর কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতার কারণে পাঠ্যবই অডিও আকারে রেকর্ড করে পড়তে হয় মিজানকে। পরীক্ষায় প্রয়োজন হয় শ্রুতিলেখকের। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় তাঁর পড়াশোনার খরচও বেশি। আর্থিক সংকটে উচ্চশিক্ষা থমকে যাওয়ার আশঙ্কায় এককালীন অনুদানের আবেদন করেন তিনি।
চিকিৎসার অর্থ চেয়ে গণশুনানিতে আসেন পটিয়ার রাজমিস্ত্রি আজিজুল হকও। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না তিনি। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও তিন ছেলের সংসার চালানোর পাশাপাশি নিজের চিকিৎসার ব্যয় বহন করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফটিকছড়ির হাফেজ মো. আবু তাহের ২০২২ সালে স্ট্রোক করার পর দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি; কথা বলতেও পারেন না। নিজের জায়গা-জমি নেই, উন্নত চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও নেই তাঁর। এমন পরিস্থিতিতে সহযোগিতার আশায় জেলা প্রশাসকের গণশুনানিতে আসেন তিনি।
হৃদ্রোগে আক্রান্ত পিয়া আকতারের নিজের চিকিৎসার পাশাপাশি রয়েছে অসুস্থ স্বামী ও সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব। দুর্ঘটনায় ডান পা পুড়ে যাওয়া উম্মে সানিয়া পুষ্পও তিন মাস ধরে অসুস্থ। সন্তানকে নিয়ে আর্থিক কষ্টে দিন কাটছে তাঁর। একইভাবে আর্থিক সংকটে থাকা লুবনা আকতার ও হাজেরাও সহায়তার প্রত্যাশায় গণশুনানিতে আবেদন নিয়ে উপস্থিত হন।
গণশুনানিতে প্রত্যেকের কথা আলাদাভাবে শোনেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। শুধু আবেদনপত্রে লেখা তথ্যের ওপর নির্ভর না করে তাঁদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কেও সরাসরি জানতে চান তিনি। কারও চিকিৎসা, কারও পড়াশোনা, আবার কারও পরিবার চালানোর সংকট বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেন।
জেলা প্রশাসনের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে বুধবার তাই উঠে আসে মানুষের জীবনের নানা সংকট ও প্রত্যাশার গল্প। কারও চাওয়া একটি নিরাপদ আশ্রয়, কারও সন্তানের চিকিৎসা, আবার কারও স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া।
সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়। তবে অসহায় মানুষকে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়া, তাঁদের সংকট মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য দিয়ে জেলা প্রশাসকের এই গণশুনানি প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের সরাসরি যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬
মোঃ ওয়াশিম, চট্টগ্রাম
তিন মেয়েকে নিয়ে মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠাঁই নেই বিধবা সারাবান তাহুরার। সন্তানের হার্নিয়া অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন রাজীব দাশ। বাবা-মাকে হারানো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মিজান মিয়ার উচ্চশিক্ষাও অর্থাভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কেউ আবার প্যারালাইসিস, হৃদ্রোগ কিংবা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারছেন না।
জীবনের এমন নানা সংকট নিয়ে বুধবার (১২ আগস্ট) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে হাজির হন তাঁরা। সঙ্গে ছিল নিজেদের অসহায়ত্ব ও প্রয়োজনের কথা জানিয়ে লেখা আবেদনপত্র।
তবে আবেদন গ্রহণ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। একে একে প্রত্যেকের কথা শোনেন তিনি। জানতে চান তাঁদের পরিবার, আয়-রোজগার, চিকিৎসা, পড়াশোনা ও বসবাসের বর্তমান পরিস্থিতি। প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কয়েকজনকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করেন তিনি।
গণশুনানিতে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছেন বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের সারাবান তাহুরা। প্রায় দুই বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন মেয়েকে নিয়ে তাঁর জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর তিন মেয়ের বয়স ১০, ৮ ও ৪ বছর। স্বামী পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন। সেখানে নিরাপত্তাহীনতার মুখে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় তিন মেয়েকে নিয়ে দেশে ফেরেন সারাবান।
দেশে ফেরার পর স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের সহযোগিতায় প্রায় এক বছর আশ্রয়ে ছিলেন তিনি। পরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পূর্ব চাম্বল আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে সাময়িকভাবে থাকার সুযোগ পান। কিন্তু ঘরটি অন্য একজনের নামে বরাদ্দ থাকায় সেটিও ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে তাঁকে।
নিজের কোনো জমি বা বসতভিটা নেই সারাবানের। সেলাইয়ের কাজ করে তিন মেয়ের ভরণপোষণ চালান তিনি। সন্তানদের নিয়ে আবারও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় বাহারছড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে সরকারি খাস জমিতে একটি ঘর নির্মাণ কিংবা পুনর্বাসনের আবেদন নিয়ে জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হন তিনি।
সন্তানের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চেয়ে গণশুনানিতে আসেন চন্দনাইশের রাজীব দাশ। তাঁর শিশুসন্তান জন্মগত হার্নিয়ায় আক্রান্ত। অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। অর্থের অভাবে সন্তানের চিকিৎসা যেন বন্ধ না হয়, সে জন্য জেলা প্রশাসকের সহযোগিতা চান তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মিজান মিয়ার সংকট আবার ভিন্ন। তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বাবা-মা দুজনই মারা গেছেন। তাঁর পড়াশোনার ব্যয় বহনের মতো পরিবারে আর কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতার কারণে পাঠ্যবই অডিও আকারে রেকর্ড করে পড়তে হয় মিজানকে। পরীক্ষায় প্রয়োজন হয় শ্রুতিলেখকের। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় তাঁর পড়াশোনার খরচও বেশি। আর্থিক সংকটে উচ্চশিক্ষা থমকে যাওয়ার আশঙ্কায় এককালীন অনুদানের আবেদন করেন তিনি।
চিকিৎসার অর্থ চেয়ে গণশুনানিতে আসেন পটিয়ার রাজমিস্ত্রি আজিজুল হকও। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না তিনি। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও তিন ছেলের সংসার চালানোর পাশাপাশি নিজের চিকিৎসার ব্যয় বহন করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফটিকছড়ির হাফেজ মো. আবু তাহের ২০২২ সালে স্ট্রোক করার পর দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি; কথা বলতেও পারেন না। নিজের জায়গা-জমি নেই, উন্নত চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও নেই তাঁর। এমন পরিস্থিতিতে সহযোগিতার আশায় জেলা প্রশাসকের গণশুনানিতে আসেন তিনি।
হৃদ্রোগে আক্রান্ত পিয়া আকতারের নিজের চিকিৎসার পাশাপাশি রয়েছে অসুস্থ স্বামী ও সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব। দুর্ঘটনায় ডান পা পুড়ে যাওয়া উম্মে সানিয়া পুষ্পও তিন মাস ধরে অসুস্থ। সন্তানকে নিয়ে আর্থিক কষ্টে দিন কাটছে তাঁর। একইভাবে আর্থিক সংকটে থাকা লুবনা আকতার ও হাজেরাও সহায়তার প্রত্যাশায় গণশুনানিতে আবেদন নিয়ে উপস্থিত হন।
গণশুনানিতে প্রত্যেকের কথা আলাদাভাবে শোনেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। শুধু আবেদনপত্রে লেখা তথ্যের ওপর নির্ভর না করে তাঁদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কেও সরাসরি জানতে চান তিনি। কারও চিকিৎসা, কারও পড়াশোনা, আবার কারও পরিবার চালানোর সংকট বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেন।
জেলা প্রশাসনের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে বুধবার তাই উঠে আসে মানুষের জীবনের নানা সংকট ও প্রত্যাশার গল্প। কারও চাওয়া একটি নিরাপদ আশ্রয়, কারও সন্তানের চিকিৎসা, আবার কারও স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া।
সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়। তবে অসহায় মানুষকে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়া, তাঁদের সংকট মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য দিয়ে জেলা প্রশাসকের এই গণশুনানি প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের সরাসরি যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

আপনার মতামত লিখুন