বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হলেও সময়ের পরিক্রমায় তা পরিণত হয় একটি গণআন্দোলনে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমজীবী মানুষ, নারী, প্রবীণ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কিশোর-তরুণরাও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন এবং দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের শাসনের ইতি টেনে তাঁর সরকারের পতন ঘটে। তারপর থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী ও সমর্থকেরা এই দিনটিকে প্রতীকীভাবে ‘৩৬ জুলাই’ নামে অভিহিত করেন।
আন্দোলনের সূচনা
২০২৪ সালের জুন মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা কোটা ব্যবস্থার সংস্কার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবি তুলে ধরতে থাকেন।
সংঘর্ষ ও উত্তেজনা
আন্দোলন যত বিস্তৃত হতে থাকে, ততই বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা বাড়তে থাকে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্র লীগের সদস্যদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ সামনে আসে। সরকারও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এতে জনমনে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
আবু সাঈদের আত্মত্যাগ
১৬ জুলাই ২০২৪ রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শাহাদাৎ বরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়।
আবু সাঈদের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। আন্দোলনে পরবর্তী সময়ে মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, ওয়াসিম আকরামসহ আরও অনেক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তাঁদের স্মরণে দেশের বিভিন্ন স্থানে শোকসভা, দোয়া মাহফিল, মোমবাতি প্রজ্বলন এবং প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়।
ছাত্র আন্দোলন থেকে গণআন্দোলন
জুলাইয়ের শেষ দিকে আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে সম্পৃক্ত হন। দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী, প্রবীণ এবং অনেক ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরী এমন কি বাবা মায়ের কোলে শিশুদেরও আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়।
আন্দোলনের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও দ্রুত অবনতি ঘটে। সরকার কারফিউ জারি করে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং কয়েক দিনের জন্য ইন্টারনেট ও মোবাইল ডেটা সেবা সীমিত বা বন্ধ রাখা হয়। একই সময়ে র্যাবের একটি হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ব্যাপক আলোচনায় আসে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে সমালোচনা সৃষ্টি হয় এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও ওঠে। এসব ঘটনার মধ্যেই আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এক দফার ঘোষণা
ক্রমেই আন্দোলনের দাবি কোটা সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে। ৩ আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। সেই একমাত্র দাবি ছিল তৎকালীন সরকারের পদত্যাগ।
এক দফা ঘোষণার পর আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ৪ আগস্ট দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও অসহযোগ কর্মসূচি পালিত হয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। অনেক সরকারি স্থাপনা, দলীয় কার্যালয় ও বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
৫ আগস্ট: '৩৬ জুলাই'
৫ আগস্ট ২০২৪ ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সেদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। সকাল থেকেই বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল রাজধানীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দিনভর উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।
এরপর রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং পরবর্তীতে নোবেল জয়ী ড.ইউনুসকে প্রধান করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহন করে। আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীগণ দিনটিকে প্রতীকীভাবে ‘৩৬ জুলাই’ নামে অভিহিত করেন, যা তাঁদের কাছে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ও বিজয়ের প্রতীক।
প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য থাকলেও প্রাণহানির ঘটনা আন্দোলনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
নতুন বাস্তবতা
সরকার পরিবর্তনের পর দেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়। প্রশাসনিক সংস্কার, নির্বাচন, বিচার, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া প্রাণহানি ও সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির দাবিও বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপিত হয়।
ইতিহাসের পাতায় ৫ আগস্ট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। কারও কাছে এটি একটি গণঅভ্যুত্থান, কারও কাছে গণআন্দোলন, আবার কারও কাছে একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের দিন। ঘটনাটির মূল্যায়নে রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও এ বিষয়ে দ্বিমত নেই যে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাইকে আন্দোলনকারীরা স্বৈরাচার পতন দিবস হিসেবেও আখ্যায়িত করেন।
আজও আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, ওয়াসিম আকরামসহ আন্দোলনে নিহতদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁদের আত্মত্যাগ এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের নানা ঘটনা বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনায় দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে থাকবে।
-গাজী আল আমিন
মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রতিনিধি।

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হলেও সময়ের পরিক্রমায় তা পরিণত হয় একটি গণআন্দোলনে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমজীবী মানুষ, নারী, প্রবীণ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কিশোর-তরুণরাও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন এবং দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের শাসনের ইতি টেনে তাঁর সরকারের পতন ঘটে। তারপর থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী ও সমর্থকেরা এই দিনটিকে প্রতীকীভাবে ‘৩৬ জুলাই’ নামে অভিহিত করেন।
আন্দোলনের সূচনা
২০২৪ সালের জুন মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা কোটা ব্যবস্থার সংস্কার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবি তুলে ধরতে থাকেন।
সংঘর্ষ ও উত্তেজনা
আন্দোলন যত বিস্তৃত হতে থাকে, ততই বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা বাড়তে থাকে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্র লীগের সদস্যদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ সামনে আসে। সরকারও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এতে জনমনে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
আবু সাঈদের আত্মত্যাগ
১৬ জুলাই ২০২৪ রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শাহাদাৎ বরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়।
আবু সাঈদের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। আন্দোলনে পরবর্তী সময়ে মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, ওয়াসিম আকরামসহ আরও অনেক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তাঁদের স্মরণে দেশের বিভিন্ন স্থানে শোকসভা, দোয়া মাহফিল, মোমবাতি প্রজ্বলন এবং প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়।
ছাত্র আন্দোলন থেকে গণআন্দোলন
জুলাইয়ের শেষ দিকে আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে সম্পৃক্ত হন। দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী, প্রবীণ এবং অনেক ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরী এমন কি বাবা মায়ের কোলে শিশুদেরও আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়।
আন্দোলনের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও দ্রুত অবনতি ঘটে। সরকার কারফিউ জারি করে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং কয়েক দিনের জন্য ইন্টারনেট ও মোবাইল ডেটা সেবা সীমিত বা বন্ধ রাখা হয়। একই সময়ে র্যাবের একটি হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ব্যাপক আলোচনায় আসে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে সমালোচনা সৃষ্টি হয় এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও ওঠে। এসব ঘটনার মধ্যেই আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এক দফার ঘোষণা
ক্রমেই আন্দোলনের দাবি কোটা সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে। ৩ আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। সেই একমাত্র দাবি ছিল তৎকালীন সরকারের পদত্যাগ।
এক দফা ঘোষণার পর আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ৪ আগস্ট দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও অসহযোগ কর্মসূচি পালিত হয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। অনেক সরকারি স্থাপনা, দলীয় কার্যালয় ও বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
৫ আগস্ট: '৩৬ জুলাই'
৫ আগস্ট ২০২৪ ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সেদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। সকাল থেকেই বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল রাজধানীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দিনভর উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।
এরপর রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং পরবর্তীতে নোবেল জয়ী ড.ইউনুসকে প্রধান করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহন করে। আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীগণ দিনটিকে প্রতীকীভাবে ‘৩৬ জুলাই’ নামে অভিহিত করেন, যা তাঁদের কাছে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ও বিজয়ের প্রতীক।
প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য থাকলেও প্রাণহানির ঘটনা আন্দোলনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
নতুন বাস্তবতা
সরকার পরিবর্তনের পর দেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়। প্রশাসনিক সংস্কার, নির্বাচন, বিচার, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া প্রাণহানি ও সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির দাবিও বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপিত হয়।
ইতিহাসের পাতায় ৫ আগস্ট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। কারও কাছে এটি একটি গণঅভ্যুত্থান, কারও কাছে গণআন্দোলন, আবার কারও কাছে একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের দিন। ঘটনাটির মূল্যায়নে রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও এ বিষয়ে দ্বিমত নেই যে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাইকে আন্দোলনকারীরা স্বৈরাচার পতন দিবস হিসেবেও আখ্যায়িত করেন।
আজও আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, ওয়াসিম আকরামসহ আন্দোলনে নিহতদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁদের আত্মত্যাগ এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের নানা ঘটনা বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনায় দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে থাকবে।
-গাজী আল আমিন
মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রতিনিধি।

আপনার মতামত লিখুন